এটি দেশের প্রধান বন্দর হওয়ায় এ বিভাগকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বৃহত্তম উৎপাদনমুখী শিল্প-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অঞ্চল। অর্থনৈতিক সম্প্রসারণে ঢাকা বিভাগের প্রবৃদ্ধি যেখানে ২৪ শতাংশ, সেখানে চট্টগ্রামে এ হার ৫৪ দশমিক ৩২ শতাংশ। অথচ এ বিভাগের উৎপাদনমুখী শিল্পে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার খুবই সীমিত, মাত্র ১ দশমিক ৯৬ শতাংশে অর্থনৈতিক ইউনিটে কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে। দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হলেও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে পিছিয়ে থাকায় দেশী-বিদেশী প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম। পাশাপাশি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধির ঝুঁকিও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর চূড়ান্ত ফলাফলে এ বিপরীতমুখী চিত্র উঠে এসেছে। দেশের চতুর্থ অর্থনৈতিক শুমারির চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগে অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে প্রায় ২০ লাখ ৪৮ হাজার ৮৪০টি, যা ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল ১৩ লাখ ২৭ হাজার ৬২৯টি। অর্থাৎ ১০ বছরের ব্যবধানে বিভাগটিতে অর্থনৈতিক সম্প্রসারণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৪ দশমিক ৩২ শতাংশ। এর মধ্যে গ্রামীণ পর্যায়ে প্রায় ৬০ শতাংশ এবং শহরে ৪০ শতাংশ ইউনিট রয়েছে। তবে ঢাকা বিভাগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে এর অর্ধেকেরও কম বা ২৪ শতাংশ। ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, এ বিভাগে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৪১ হাজার ৩৩টি, ২০২৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ লাখ ৬৯ হাজার ২৮৪টিতে।
শুমারির তথ্যানুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৪ অর্থাৎ ১০ বছরে দেশের উৎপাদন খাতে অর্থনৈতিক ইউনিট গড়ে উঠেছে ১১ লাখ ২ হাজারটি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে, যা প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার ৮৪৮টি বা ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। ঢাকা বিভাগে গড়ে উঠেছে ২ লাখ ইউনিট। এছাড়া রাজশাহীতে ১ লাখ ৪৫ হাজার ও বরিশালে ৫৮ হাজার ইউনিট রয়েছে। তবে এসব উৎপাদন কেন্দ্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার খুবই সীমিত।
ঢাকা বিভাগের দুই লাখ ইউনিটের মধ্যে মাত্র ১১ হাজার ৩০০টি ইউনিট তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় এসেছে, যা মোট ইউনিটের ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অপরদিকে চট্টগ্রাম বিভাগের উৎপাদন খাতে ২ লাখ ৪০ হাজার ৮৪৮টি ইউনিট থাকলেও ৪ হাজার ৭১৫টি তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যা মোট ইউনিটের ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। তবে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে ঢাকার চেয়ে ২ দশমিক ৯ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে এ বিভাগ।
কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে অভিযোজনে আরো পিছিয়ে রয়েছে রাজশাহী (১ দশমিক ৮৪ শতাংশ), রংপুর (১ দশমিক ১৯ শতাংশ), খুলনা (১ দশমিক ৪৯ শতাংশ), ময়মনসিংহ (১ দশমিক ৫৪ শতাংশ) এবং সিলেট (১ দশমিক ২৪ শতাংশ)। সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বরিশাল। বিভাগটির মাত্র ১ দশমিক ১৪ শতাংশ ইউনিট তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় এসেছে।
শুমারি অনুযায়ী, চট্টগ্রামে উৎপাদনমুখী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ। দেশের কনটেইনার বাণিজ্যের ৯৯ শতাংশই পরিবাহিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। তবুও বিভাগটিতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার কম থাকার পেছনে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের আধিপত্যকে কারণ হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের ঘাটতি কমানো না গেলে চট্টগ্রাম প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে বলে মনে করছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সিংহভাগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো চট্টগ্রামনির্ভর। আমদানি-রফতানির প্রধান কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে থাকা মানে এখানকার উৎপাদন খাত বৈশ্বিক পর্যায়ের সঙ্গে সংযোগ করতে পারছে না। এর একটি কারণ চট্টগ্রামে উৎপাদন খাতের সঙ্গে জড়িত ইউনিটগুলোর ৬০ শতাংশই গ্রামীণ পর্যায়ের। এছাড়া বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের। ফলে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে ক্ষুদ্র ব্যবসা ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ বা ১২ লাখ ২৫ হাজার ৫২১টি এবং কুটির শিল্প ব্যবসা ৩৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ বা ৭ লাখ ১২ হাজার ২২৮টি।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) ২০২১ সালের একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব প্রতিষ্ঠানে ১০ জনের কম কর্মচারী রয়েছে, সেগুলোতে বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের তুলনায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার তিন-চার গুণ কম। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন পণ্য তৈরি এবং রফতানি প্রবৃদ্ধি তথা উন্নতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা। তবে চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোয় এর ব্যবহার অনেক কম বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মাত্র দশমিক ৪ শতাংশ তথা সাড়ে সাত হাজার ইউনিটে রয়েছে গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা।
তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে চট্টগ্রাম পিছিয়ে থাকলে দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এর মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ার ঝুঁকি দেখছেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ড. এম মাসরুর রিয়াজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এখন তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার আর নতুন কিছু নয়; বরং অত্যাবশ্যকীয়। সে জায়গায় দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র যদি তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে পিছিয়ে থাকে তাহলে এটি মূলত একটি ডিজিটাল ডিভাইডের ইঙ্গিত। এর ফলে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।’
অর্থনৈতিক সুযোগ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন যদি সমভাবে বিস্তৃত না হয়, তাহলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সুষম আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন ড. এম মাসরুর রিয়াজ।